প্রবীণ কথা,পরিবারের নিকট সম্মান পাওয়া প্রবিণদের আধিকার

বার্ধক্য মানব জীবনের একটি অবধারিত এবং জটিল অধ্যায়। মায়ের পেটে ভ্রুণ থেকে  শুরু করে ক্রম শশৈশব ও কৈশর পেরিয়ে যৌবনে চূড়ান্ত উত্থান হয় মানব জীবনের। তার পরই শুরু হয় ক্ষয়ের পালা।জীবনের এক পর্যায়ে এসে একজন শিশু আর একজন প্রবীণ মানুষ একই রকম হয়ে যায়।

 কিন্তু শিশু ও প্রবীণ ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক অবস্থা থাকে ভিন্ন। শিশু থাকে অবুঝ এবং অভিজ্ঞতাশূণ্য। কিন্তু একজন প্রবীণ ব্যক্তি শিশুরমত অবুঝ হলেও থাকে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বলেই তাকে অবহেলা করলে সে অবোধ, অবুঝ, জেদী ও উদাস হয়ে যায়।

জীবন বদলেছে, বদলে গেছে সময় তা অনেকেই মেনেনিতে পারেন না। তারা চান, যৌবনে পিতা-মাতার সঙ্গে যে ভাবে তারা ব্যবহার করেছেন তাদের সন্তানেরা ও সেই একই ভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবহার করবে। তা ছাড়া তারাইতো আদর যত্ন করে তাদের মানুষ করেছে, তবে কেন তাদের সঙ্গে এমন অনুচিত আচারণ করবে। কর্মব্যস্ততায় পরিবারে কারোরই সময় হয় না বাবা-মায়ের সাথে কিছুটা সময় কাটানোর।তখন পরিবারের সদস্যরা দেখভাল করছেনা এটাই হয়ে ওঠে তারকাছে মূখ্যকারণ।

তাছাড়া জীবনের পড়ন্ত বেলায় রোগ-শোকসহ নানা সমস্যা শরীর ও মনে বাসা বাঁধে, মেজাজ হয় খিটখিটে। সকলের কাছ থেকেই আদর, যত্ন ও সম্মান পেতে চান। মনে হয় এতোদিন যা করেছি সব বৃথা।এমন ভাবনা থেকে সৃষ্টি হয় মানসিক সমস্যার। কাজের মধ্যে, পরিবারের মাঝে, আত্নীয়-স্বজন বেষ্টিত থাকলে মন প্রফুল্ল থাকে এবং প্রবীণ বয়সেও মানুষ বেচেঁথাকার সাহস খুঁজে পায়। সম্মানের সাথে বেচেঁথাকার সাহস খুঁজে পায়।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বার্ধক্যর কারণ হিসাবে মানব শরীরের সেল’র নির্দিষ্ট সময় পর ক্রমান্বয়ে ক্ষয়ে যাওয়া এবং পুনরুৎপাদন বন্ধ হওয়াকেই প্রধান কারণ বলে মনে করেন।জন্মহার ও মৃত্যুহার হ্রাস পাওয়ার ফলে সারাপৃথিবীতেই প্রবীণদের সংখ্যা দ্রুত হারে বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ ও এর ব্যতিক্রম নয়।

১৯১১ সালে বাংলাদেশে মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ, ১৯৬১ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ২৪ লাখ, ১৯৯১ সালে হয় ৫৭ লাখ এবং ২০০১ সালে হয় ৭৬ লাখ।পরিসংখ্যান অনুযায়ী ধারণা করা যায় ২০৫০ সালে এই সংখ্যা যা হবে তা মোট জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ। যা হবে বাংলাদেশের জন্য আর একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। দেখা যাবে প্রবীণরা প্রতিনিয়তই বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এর ফলে, প্রবীণ দারিদ্র এবং দুস্থতাউন্নয়ন এজেন্ডার সামনের সারিতে চলে আসবে।

আসন্ন এই চ্যালেঞ্জ কে মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার এখনই গ্রহণ করেছে বিভিন্ন উদ্যোগ। প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ, দারিদ্রমুক্ত, কর্মময়, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ সামাজিক জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৭ নভেম্বর ২০১৩ তরিখে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন পায় জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩। নীতিমালায় কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে যে গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হ’ল:

পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি সহ সকল ক্ষেত্রে প্রবীণ ব্যক্তিদের অবদানের স্বীকৃতি প্রদান।

নতুন প্রজন্মগুলির মধ্যে সংহতি জোরদার করণপূর্বক আন্তঃপ্রজন্ম যোগাযোগ ও সংহতি স্থাপন করা।

প্রবীণ ব্যক্তিদের প্রাপ্যস ম্মান প্রদানের লক্ষ্যে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা।

প্রবীণ ব্যক্তিদের জীবন ও সম্পত্তি নিরাপত্তায় বিশেষ কার্যক্র মহাতে নেওয়া।

দারিদ্র দুরীকরণের লক্ষ্যে প্রবীণ ব্যক্তিদের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচীতে অন্তর্ভূক্তকরা।

আর্থিক নিরাপত্তার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রবীণবান্ধব সঞ্চয় ও বীমা প্রকল্প চালু করা।

প্রবীনদের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম হাতে নেওয়া।

দুর্যোগকালীন সময়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রবীণ ব্যক্তিদের সহায়তা ও সুরক্ষা প্রদান করা।

নীতিমালাটি বাস্তবায়ন, তদারকি ও মূল্যায়নের জন্য জাতীয়, জেলা, থানা / উপজেলা এবং পৌরওয়ার্ড / ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠন করার কথা রয়েছে। এই নীতিমালার মাধ্যমে প্রবীণরা তাৎক্ষনিক ভাবে হয়তো লাভবান হবেন না, কিন্তু প্রবীণ বিষয়ে সম্মিলিত ভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরী হবে। এবং এজন্য প্রয়োজন প্রবীণ নীতিমালার আলোকে জাতীয় কর্মকৌশল ও পরিকল্পনা তৈরী। এই কর্মকৌশল ও কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ণের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। এ জন্য এখনি কিছু কাজ জরুরী ভিত্তিতে করা প্রয়োজন। যেমনঃ

পৌরওয়ার্ড/ ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রবীণ কল্যান কমিটি গঠন;

প্রবীণ নীতিমালার ব্যাপক প্রচার;

নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সম্মিলিত উদ্যোগ কে শক্তিশালী করা;

স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবী জানানো;

সরকারের সাথে নীতিমালা বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা ও সংলাপের সূচনা করা -চূড়ান্ত পর্যায়ে জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রক্রিয়া ঠিক করা।

এ সকল কাজ অতি জরুরী বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ইতিমধ্যেই কিছুকা র্যক্রম হাতে নিয়েছে।

প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় ও নীতিমালা বাস্তবায়নে পিছিয়ে থকলে চলবে না। প্রবীণদের জন্য মর্যাদাপূর্ন, দারিদ্রমুক্ত, কর্মময়, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ সামাজিক জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উপরে উল্লেখিত কার্যক্রমের পাশাপাশি নতুন নতুন কার্যক্রম উদ্ভাবন ও সম্পাদন করে একটি সুনির্দিষ্ট জায়গায় পৌছানোর এখনই সময়। এজন্য প্রয়োজনীয় দাবিগুলোকে সুনির্দিষ্ট করতে হবে এবং দাবি আদায়ে সময়উপযোগী কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

EDL-1

প্রবীণদের অধিকার ক্ষায় কিছু দাবিঃ

প্রবীণ ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় ভাবে “জ্যেষ্ঠনাগরিক”  হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে তাদের জাতীয় পরিচয় পত্রের মত কার্ড করে দেওয়া।

ক্রমবর্ধমান নগরায়ন ও প্রচলিত যৌথপরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার কারণে প্রবীণদের সার্বিক সুরক্ষার আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

সরকারী ও বেসরকারি ভাবে প্রবীণ ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সুবিধাদি সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ করা।

সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রবীণ ব্যক্তিগণ যাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত চিকিৎসা সুবিধা লাভ করতে পারেন তার প্রতি গুরুত্বারোপ করা।এ জন্য পৃথক কাউন্টার ও ওয়ার্ড স্থাপন এবং প্রত্যেক হাসপাতালে কমপক্ষে ৫ শতাংশ সিট প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষণ করা।

প্রবীণদের জন্য মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা, যেমনঃ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, চেখের সমস্যা, বাত, কানের সমস্যা, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয় সমূহ দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে।

বয়স্ক ভাতা ভোগীদের সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা পাওয়া নিশ্চিত করা।

প্রবীণ নারীদের স্বাস্থ্যগত বিশেষ জটিলতা ও অসুস্থতার বিষয়টি গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করে উপযুক্ত চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করা।

প্রবীণ ব্যক্তিদের সৃষ্টিকৃত কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সামাজিক ঐতিহ্য ও দক্ষতা কাজেলাগানো এবং পাঠাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাকেন্দ্র ও সাংস্কৃতিককেন্দ্রে প্রবীণ ব্যক্তিদের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

সরকারি ও বেসরকারি এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ কল্যাণ তহবিল গঠন করা।

প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্রের ন্যায় “প্রবীণ কল্যাণ সঞ্চয়পত্র” প্রবর্তণকরা।

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুদানে তহবিল গঠন এবং প্রবীণ ব্যক্তিদের কল্যাণে ব্যয় করা।

বাজেটে প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য অর্থ বরাদ্দ এবং সরকারি অনুদানের পরিমাণ বৃদ্ধি করা।

খুলনা সমাজ সেবা অধিদপ্তর ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ’র প্রবীণদের নিয়ে কার্যক্রমঃ

খুলনা সমাজ সেবা অধিদপ্তর ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে প্রবীণদের নিয়ে বেশকিছু কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।সমাজ সেবা অধিদপ্তরের পরিচালক শেখ আব্দুল হামিদ ও সহকারী পরিচলক মাহ্‌বুবার হমান এবং জেলা মহিলা বিষয়ক অফিসার নার্গিস ফাতেমা জামিন’র নিকট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কার্যক্রমগুলো হলো-

সমাজ সেবা অধিদপ্তরঃ

বয়স্ক ভাতা প্রদান – ষাটউর্দ্ধ দুঃস্থ পুরুষ এবং নারীদের এই ভাতা প্রদান করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে অক্ষম, তালাকপ্রাপ্ত, স্বামী পরিত্যক্তা, বিপত্নীক, নিঃসন্তান, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, ভূমিহীন বয়স্ক প্রবীণদের বেশী প্রধান্য দেওয়া হয়।খুলনা জেলায় এ পর্যন্ত মোট বয়স্ক ভাতা ভোগীর সংখ্যা ৪২,৭৩৬জন।

চিকিৎসা ভাতা প্রদান – চিকিৎসা ভাতা সাধারণত সকল বয়সের পুরুষ ও মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য কিন্তু এ ক্ষেত্রে বয়স্কদের বিশেষ ভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা প্রদান – সাধারণত সকল বয়সের দুঃস্থ বিধবাদের এই ভাতা প্রদান করা হয় ,কিন্তু এ ক্ষেত্রেও বয়স্কদের বিশেষ ভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়।খুলনা জেলায় বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা প্রাপ্তদের সংখ্যা ১৫,৯১৫ জন।

হিজড়া ভাতা প্রদান – পঞ্চাশোর্ধ হিজড়াদের মাসে ৩০০ টাকা করে ভাতা প্রদান করা হবে। যা চলতি আগষ্ট মাস থেকে কার্যকর হবে।

মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরঃ

ভিজিডি প্রদান – পঞ্চাশোর্দ্ধ মহিলা, যারা সরকারী কোন প্রকার সাহায্য-সহায়তা পায় না তাদের ভিজিডি কার্ড প্রদান করা হয়। কার্ডের মাধ্যমে তারা প্রতি মাসে ৩০ কেজি গম পায়।প্রতি দুই বছর পর পর এই ভিজিডি কার্ড নতুন করে নিবন্ধন করতে হয়।

ঋণ দান – সাধারণত সকল বয়সের মহিলা উদ্যোক্তারাই এই ঋণ নিতে পারে। কিন্তু বয়স্ক মহিলাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। এক থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়। ঋণ গ্রহীতাদের মূল টাকার সাথে ৫-১০% হারে সার্ভিস চার্জ প্রদান করতে হয়।

তবে শেষ কথা হলো মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে চায় একজন ব্যক্তি, সে তরুণ হোক আর প্রবীণ হোক। এ পৃথিবীর আলো বাতাস সবার জন্য। আনন্দে বেঁচে থাকার অধিকার, প্রাপ্য সম্মান পাওয়ার অধিকার সবার আছে। প্রবীণ হোক, শিশুহোক, নারী হোক, সবারই সম্মান এবং আনন্দের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার থাকে পরিবারের কাছে। একজন মানুষের কাছে পরিবারই প্রধান এবং প্রথম। তাই পরিবার যদি কাউকে সমাদর না করে, সম্মান না দেয় তা হলে সমাজ বা রাষ্ট্রের কাছে সমাদর বা সম্মান না পেলে সেই মানুষটির কিছুই যায় আসে না। সে থাকে জীবম্মৃত।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
ট্যাগসমূহঃ 
Subscribe to Comments RSS Feed in this post

One Response

  1. প্রবীণদের নিয়ে লেখাটা খুব ভাল লাগল। প্রবীনদের নিয়ে এখন আর কেউ ভাবে না। প্রবীণদের নিয়ে আরো লেখা চাই। – – – ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*
*

Current ye@r *