সবে সকাল ১০ টা। এরই মধ্যে নিজ দেহ বিক্রির জন্য সাজগোজ করে বসে আছেন সুমি, তার টাঙ্গাইলের কান্দাপাড়া দেহজীবী পল্লির ঘরের সামনে। কারণ দেহ বিক্রি না হলে তার খাবার জোটেনা।
সুমি জানান, এ পল্লীতে তার মত আরও সাড়ে পাঁচশ’ থেকে সাড়ে ছয়শ’ দেহজীবী বাস করেন, যাদের বেঁচে থাকতে প্রতিদিন প্রয়োজন হয় ঘর ভাড়া ৩শ’টাকা, রাঁধুনী ২শ’ টাকা সহ তাদের নিজেদের খাওয়া পরা চিকিৎসার টাকা। অন্যদিকে, একজন খরিদ্দার ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা দেন। কোনো দিন একজন থেকে তিন-চারজন খরিদ্দার জোটে, আবার একাধিক দিন কোনো খরিদ্দারই জোটে না।
সুমি বলেন, “এ জীবন আমার অসহ্য, কিন্তু আমার কোন উপায় নেই। সমাজের ভয়ে আমার পরিবার আত্মিয়-স্বজন আমাকে স্বাভাবিক জীবনে মেনে নেবে না। জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে আমাকে এখানেই থাকতে হবে, হয়তো আমৃত্যু!”
এই পল্লীর আর একজন দেহজীবী ময়না জানান, মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি বিক্রি হয়ে যান এ পল্লীর একজন সর্দারনী’র কাছে, যে তাকে নিয়মিত মোটাতাজাকরণের ওষুধ (বিভিন্ন ধরনের স্টরয়েড) খাইয়ে মোটা করে তোলে এবং মাত্র ১৩ বছর বয়সেই কর্মে লাগিয়ে দেয়। ময়না জানান, ওষুধ খাইয়ে মোটাতাজা করা এখানকার একটা নিয়মিত পদ্ধতি, যা বিপুল সংখ্যক মেয়েদের উপর প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক খান আহম্মেদ হিলালী বলেন, “এ ধরনের স্টরয়েড জাতীয় ওষুধ মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, যা ভবিষ্যতে ব্যবহারকারীর কিডনী, লিভার ধংস করে তার মৃত্যু তরান্বিত করতে পারে।”
দেহজীবী স্বর্ণা জানান, তাদের এ পল্লীতে যৌন রোগ প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা নেই। এ অবস্থায় এইচআইভি/এইডস্ সহ মারাত্মক সব যৌন রোগের হুমকির মধ্যেই তারা কাজ করছেন। এর ফলে তারা জানতেও পারছেন না তাদের কারো দেহে কোনো রোগ বাসা বেধেছে কি-না, যার অনেকগুলিই সোয়াচে রোগ।
দেহেজীবী আসমা জানান, এ পল্লীতে দেহজীবী বাদেও তাদের শতাধিক বিভিন্ন বয়সের সন্তান তাদের সাথে বাস করে। অনেকের মা’ও তাদের সাথে বাস করে, যারা কর্মক্ষম নয়। আর যৌন রোগ বাদেও আরও বিভিন্ন রোগে তারা আক্রান্ত হন, কিন্তু তাদের জন্য সরকারী-বেসরকারী কোন চিকিৎসা সহয়তাই নেই। শুধু চিকিৎসাই নয়, প্রান্তিক মানুষদের জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা সহ খাদ্য সহয়তা দিচ্ছে যা তারা কিছুই পান না বা তাদের দেওয়া হয় না। আসমা বলেন, “ আমরা দেহজীবী এটাই আমাদের অপরাধ, তাই ঘৃণা ছাড়া এই সমাজ-রাষ্ট্র থেকে আমাদের কিছুই পাওয়ার নেই।” আসমা আরও জানান, এ পল্লীতে সরকারী নিয়ম মেনেই সকলে বাস করছেন, বে-আইনী ভাবে একটি মেয়েও এখানে নেই।
দেহজীবী পেশা কি নিষিদ্ধ ঃ বাংলাদেশে দেহজীবী পেশা নিসিদ্ধ কি-না জানতে চাইলে আইনজীবী এ্যাডভোটে হারুনুর রশিদ জানান, বাংলাদেশের আইনে দেহজীবী পেশা নিষিদ্ধ নয়। কেউ এ বৃত্তি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করতে চাইলে তাকে অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে এবং সেই মর্মে একজন ম্যাজিষ্ট্রেটের স্বাক্ষরযুক্ত সার্টিফিকেট থাকতে হবে, যা তার কর্ম এলাকার থানায় নথিভুক্ত থাকবে।
ফিরে দেখা কান্দাপাড়া ঃ স্থানীয় তথাকথিত সমাজপতিদের নির্দেশে ২০১৩ সালের ১২ জুন টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কান্দাপাড়া দেহজীবী পল্লী সন্ত্রাসী-লুটেরাদের আক্রমণের শিকার হয় বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ।
পল্লরি বাসিন্দা রাহেলা বলেন, কয়েকদিন যাবৎ কানাঘুসা চলছিলো যে তাদের পল্লী ভেঙ্গে দেওয়া হবে। সে সময় প্রায় এক হাজার মেয়ে এখানে থাকতো। এ সংবাদে আতঙ্কিত হয়ে কয়েকশ’ মেয়ে রাতারাতি পালিয়ে যায়। বাকিরা তখনও সিদ্ধান্তহীন। এ অবস্থায় ১২ জুন দুপুরের পর বহু মানুষ দেহজীবী পল্লীর সামনে জড় হয়ে চিৎকার করে মেয়েদের চলে যেতে বলে, অন্যথায় পল্লীতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। এ অবস্থায় পুরো পল্লীতে আতংক ছড়িয়ে পড়ে এবং মেয়েরা তাদের শিশুদের নিয়ে পালাতে থাকে, আর তখনই দলে দলে উন্মত্ত লুটেরারা পল্লী আক্রমণ করে শুরু করে ব্যাপক লুটপাট এবং শিশু ও মেয়েদের উপর নির্যাতন, যা সারারাত ধরে চলে। প্রায় পাঁচ একর জমিতে ১৬০টি ঘরের এক হাজারের অধিক কামরার এ পল্লীতে চলে ব্যাপক লুটপাট। লক্ষ লক্ষ নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, টিভি, ফ্রিজ, পোশাক সহ সব কিছুই লুটেরারা নিয়ে যায়। পর দিন শুরু হয় ঘর ভাঙ্গা। দুই-তিন দিনের মধ্যে সমস্ত বসতি ধুলোয় মিসিয়ে দেওয়া হয়।
এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্তরা উচ্চ-আদালতের নিকট তাদের বসতি ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করে। উচ্চ-আদালতের নির্দেশে প্রায় ৭ মাস পরে তারা তাদের পল্লী পূনঃর্গঠনের অধিকার পায়, তবে লুট হয়ে যাওয়া তাদের শরীর বেচা সর্বস্ব তারা ফিরে পায় নি।
দেহজীবী স্মৃতিকণা বলেন, “ এ জীবন আমাদের আদৌ কাম্য নয়। যে সমাজ আমাদের সেবা নিচ্ছে সেই সমাজ-রাষ্ট্র-পরিবার এই পল্লীর বাইরে আমাদের মেনে নিতে রাজি নয়। বেচে থাকার তাগিদে, ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য আমাদের এখানেই থাকতে বাধ্য করা হচ্ছ, আমাদের নামের সাথে চিরদিনের জন্য অপমানের সিল মেরে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের কাছে আমাদের দাবি ‘সামাজিক নির্যাতন আর অপমান’ থেকে আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা হোক।”







Visit Today : 357
Who's Online : 15
সর্বশেষ মন্তব্যসমূহ