অব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত সুন্দরবন কি একটা এতিমখানা

মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় সুন্দরবনের প্রশংসা বিদেশী পর্যটকদের

জামতলি অভয়ারণ্যে প্রবেশের একমাত্র জেটিটি ভেঙ্গে পড়ে আছে

জামতলি অভয়ারণ্যে প্রবেশের একমাত্র জেটিটি ভেঙ্গে পড়ে আছে

জীববৈচ্যিত্রে অনন্য পৃথিবীর অন্যতম একক বৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবন আজ শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীর গর্ব। তাইতো ইউনেস্কো সুন্দরবনের তিনটি অভয়ারণ্য কচিখালী-কটকা, নিলকমল ও সুন্দরবন পশ্চিম অভয়ারণ্য কে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে ঘোষণা করেছে।

এ কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীব বৈচ্যিত্রের দর্শন পেতে আগ্রহী হয়ে উঠছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রকৃতি প্রেমি মানুষ। এ অবস্থা কে সামনে রেখে দেশের মানুষ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মন্ত্রীসহ সকলের দাবি বিশ্ব পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সুন্দরবন কে গড়েতোলা হোক, অবশ্যই তার জীববৈচ্যিত্রের স্বাভাবিকতা বজায় রেখেই। গড়েতোলা হোক অত্যাধুনিক ইকো-ট্যুরিজম ব্যবস্থাপনা।

কিন্তু সুন্দরবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত বন বিভাগের আমলারা যেন হাটছে এ সকল দাবির বিপরীত দিকে। সুন্দরবনের ব্যবস্থাপনার বাস্তব অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সুন্দরবন যেন একটি এতিমখানা। না আছে এর কোন মালিক, না কোন বৈধ অভিভাবক! ফলে এর অবস্থা দাড়িয়েছে অযত্নে লালিত এতিম শিশুদের মত।

মূলত সুন্দরবন ভ্রমণের মৌসুম হেমন্তের মাঝামাঝি থেকে শুরু হলেও বর্ষাকালেই সুন্দরবন ভরা যৌবনা। এর চোখ ধাঁধাঁনো বিচিত্র সবুজের বৈচ্যিত্র আর হাজারো প্রজাতির ফুল ও ফলে সুন্দরবন এ সময় সেজে থাকে যেন বিয়ের কনেটি। তাইতো বর্ষায় সুন্দরবন আরও অপরূপ। এ কারণেই প্রকৃতির রূপের পাগল দেশি-বিদেশী বহু পর্যটক বর্ষাকালে সুন্দরবন ভ্রমণে আসেন। ফলে সুন্দরবন কে পর্যটকদের জন্য সারা বছরই প্রস্তুত রাখতে হবে, আর সে জন্য সারা বছরই বেতন দিয়ে পোষা হচ্ছে বিভিন্ন পদের কর্মচারী, কিন্তু ব্যবস্থাপনার দৈন্য যেন কিছুতেই ঘোচে না!

কটকায় ভাঙাচোরা ওয়াক ওয়ে

কটকায় ভাঙাচোরা ওয়াক ওয়ে

গত ৪ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের কটকা সহ কয়েকটি এলাকা ভ্রমণ করেন একদল বিদেশী পর্যটক যাদের মধ্যে লেইহাম মিয়াতা ও কিওহিকো মিয়াতা জাপানের নাগরীক, ওয়ানডা রুথ ভিংকেইল্ড আমেরিকান এবং ইয়োন্না কাতারিনা পোল্যান্ডের অধিবাসি। তাদের সাথে ছিলেন কয়েকজন বাঙালি।

সুন্দরবনের পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষন থাকে কটকা’র জামতলি অভয়ারণ্য ঘুরে দেখা, বর্ষায় যা হয়ে ওঠে অপরূপ ও ভয়ঙ্কর সুন্দর। জামতলি বাঘের ঘর-গৃহস্থলীর এলাকা। সচরাচর বাঘের দর্শন না মিললেও বিপুল সংখ্যক বিভিন্ন বয়সের বাঘের পায়ের ছাপ এখানে দেখা যায় যত্রতত্র, যা জানান দেয় এটা বড়মিঞা’র পারিবারিক এলাকা। এ ছাড়া হাজার হাজার হরিণ, বন্য শুকর চরতে দেখা যায় জামতলির সাভানা ভূমিতে, আর বিরল প্রজাতির বিশালাকৃতির অজগর যা এখনও টিকে আছে সুন্দরবনে, মাঝে মাঝে তার দর্শন এখানেই মেলে।

যথারিতি উল্লিখিত পর্যটক দলটিও জামতলিতে ঘুরতে যায়। কিন্তু খাল থেকে জামতলিতে ঢোকার একমাত্র কাঠের ‘বিদ্ধস্ত’ জেটিতে কোন স্বাবাবিক মানুষ পা রাখতে সাহস করবে না, আর সেটা দিয়ে উঠতে গিয়ে জাপানি পর্যটক কিওহিকো মিয়াতা খালের মধ্যে পড়তে পড়তে কোন মতে অন্যের সাহায্যে রক্ষা পান, যা পুরো দেশের মানুষকেই লজ্জা দিয়েছে শুধু বন বিভাগের আমলাদের বাদে। অথচ কটকা অফিসের সামনেই বছরের পর বছর পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ টাকা দিয়ে নির্মিত পন্টুন ও স্টিলের গ্যাংওয়ে, কার জন্য কে জানে।

বছরের পর বছর পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে স্টিলের গ্যাংওয়ে কটকায়

বছরের পর বছর পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে স্টিলের গ্যাংওয়ে কটকায়

একই অবস্থা কটকায় নির্মিত পর্যটকদের হাটার জন্য কাঠের ওয়াক ওয়েগুলিরও। সেগুলির অবস্থা দেখে মনে হয় যেন পরিত্যাক্ত কোন ভূতুড়ে এলাকা অথবা ওয়াক ওয়ে নামের কৌতুক! ও পথে হাটতে গেলে নির্ঘাত পা ভাংবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

তবে পর্যটকগণ সুন্দরবনের উচ্ছসিত প্রশংসা করেন। তারা বলেন, ‘আমরা এক ধরনের ঘোরের মধ্যে আছি।’ মিঃ লেইহাম মিয়াতা বলেন,’পৃথিবীতে এ রকম আশ্চর্য ও ভয়ঙ্কর সুন্দর জায়গা আছে সুন্দরবন দেখার আগে পর্যন্ত আমার কোন ধারনাই ছিলো না।’

সুন্দরবনের বৃহৎ এলাকায় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক না থাকায় এর প্রশংসা করে মিঃ মিয়াতা বলেন, ‘এটা খুবই ভালো যে সুন্দরবন ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ বা বৈদ্যুতিকচুম্বকীয় তরঙ্গ মুক্ত এলাকা, যেখানে মানুষ এবং বনের জীবজন্তু ও গাছপালার উপর প্রতিমূহুর্তে বৈদ্যুতিকচুম্বকীয় তরঙ্গের বোমা বর্ষিত হচ্ছে না। শুধু এ কারণেই আধুনিক বিশ্বের অনেক মানুষ এখানে আসতে পছন্দ বা আগ্রহ বোধ করবেন।’

তবে বন বিভাগের ব্যবস্থাপনা আরও সুন্দর ও দায়ীত্বপূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

এ সকল বিষয়ে জানতে চাইলে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন অফিসার (ডি এফ ও) আমির হোসেন চৌধুরী বলেন, কটকা বীচ সংলগ্ন কাঠের ওয়াক ওয়ে ইতোমধ্যেই মেরামত সম্পন্ন হয়েছে এবং জামতলিতে খুব শিঘ্রই ভাসমান পন্টুনের সাথে স্টিলের গ্যাংওয়ে লাগানো হবে।

facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmailby feather
ট্যাগসমূহঃ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*
*

Current ye@r *